Tuesday, July 7, 2015

বাড়িওয়ালীর কাছ থেকে পাওয়া প্রথম পত্র!


বাড়িওয়ালার মেয়েদের প্রতি সবারই কম-বেশি আগ্রহ থাকে। আমারও যে আগ্রহ নেই, এটাই বা বলি কী করে! আর বাড়িওয়ালাটি যদি হয় ঢাকা কিংবা তার আশপাশের কোনো এলাকার এবং তার মেয়েটিও যদি হয় হালকা-পাতলা সুন্দরী টাইপের, তবে তো কোনো কথাই নেই!

আমার আব্বা একজন সরকারি কর্মচারী। কাজের জন্য তাকে প্রতি বছরই এ অঞ্চল থেকে ও অঞ্চলে বদলি হয়ে যেতে হয়। আর আব্বার অঞ্চল বদল মানেই আমাদেরও বাসা বদলের লক্ষণ! প্রায় প্রতি বছরই আমরা নতুন বাড়ি এবং বাড়িওয়ালার সান্নিধ্য পাই। ভাগ্যগুণে এ বছর পেয়ে গেলাম এক বাড়িওয়ালীর সান্নিধ্য! বাড়িওয়ালা থাকেন দেশের বাইরে। আর তাই আমরা এ বছর যে নতুন বাড়িতে উঠেছি, তার দেখাশোনার পুরোপুরি দায়িত্ব বাড়িওয়ালার স্ত্রী ওরফে বাড়িওয়ালীর কাঁধে। আব্বার মুখে শুনেছি, বাড়িওয়ালীর কাজে হেল্প করার জন্য হেল্পার হিসেবে আছেন তারই দুই মেয়ে। তো নতুন বাড়ি, বাড়িওয়ালী আর তার দুই মেয়ের মুখ দর্শনে আশা করছি এবারের বছরটা আমাদের ভালোই কাটবে।

যাই হোক, মাসের ১ তারিখে নিজেদের সহায়-সম্বল আর শীতের লেপ-কম্বল যা ছিল তাই নিয়ে উঠে গেলাম নতুন বাসায়। ফ্যামিলির বড় ছেলে হিসেবে আমার কাঁধে অলওয়েজ ম্যালা দায়-দায়িত্ব থাকে। এই যেমন কোথাও বাসা পাল্টালে বাসার মালপত্র সব নিজের কাঁধে করে বহন আর জিনিসপত্রগুলো ঠিকঠাকমতো সাজানো-গোছানো করা আর কি! আমাদের এবারের বাসাটি ভাড়া করা হলো চারতলায়। তিনতলায় থাকেন বাড়িওয়ালী এবং ওনার মেয়েরা। তো মালামাল নিয়ে ওপরে ওঠার সময় হঠাৎ মৃদু হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। আশপাশে তাকিয়ে দেখি তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুন্দরী এক মেয়ে আমাকে দেখে হাসছে। বুঝতে পারলাম তিনি আমাদের বাড়িওয়ালীরই মেয়ে। তবে মেয়েটি কেন আমাকে দেখে হাসলো এটা বোঝার সামর্থ্য আপাতত হলো না। বাসায় মালামাল সব ওঠানোর পর আব্বা, আম্মা, আমি আর ছোট ভাইবোন সবাই মিলে জিনিসপত্র সব গোছাতে লাগলাম। এমন সময় বারান্দায় দেখা সেই মেয়েটি এলো আমাদের জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে। বলল, আপনারা নতুন এসেছেন। এখনও হয়তো সম্পূর্ণ মালামাল গোছাতে আর রান্নার চুলা বসাতে পারেননি। তাই আম্মু আপনাদের জন্য দুপুরের খাবার পাঠিয়েছেন। আমার আম্মা মেয়েটির হাত থেকে খাবারগুলো নিয়ে টেবিলে রাখলেন এবং তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় করলেন। খাবার খেয়ে আমরা আবারও জিনিসপত্র গোছানোর কাজে নেমে পড়লাম এবং বিকালের মধ্যেই সবকিছু ঠিকঠাক জায়গামতো গুছিয়ে রাখতে সক্ষম হলাম।

দেখতে দেখতে নতুন বাসায় কেটে গেল আমাদের পুরো একটি সপ্তাহ। এর মধ্যেই প্রতিবেশী বাড়িওয়ালী এবং তার মেয়েদের সঙ্গে আমাদের ভালো সখ্যতা হয়ে গেল। বাড়িওয়ালীর ছোট মেয়েটির নাম টিনা। সেই আমাদের খাবার নিয়ে এসেছিল এবং আমাকে প্রথম দেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হেসেছিল। আম্মার মুখে শুনলাম, বাড়িওয়ালীর বড় মেয়েটি বিবাহিত এবং তার দু’টি সন্তানও নাকি আছে। আর ছোট মেয়েটি পড়ে ভার্সিটিতে। তার ব্যাপারে খুব একটা ইনফরমেশন পাওয়া গেল না। আমিও ভার্সিটির স্টুডেন্ট। অতএব টিনার সঙ্গে একটা রিলেশন করতে পারলে মন্দ হয় না!

কেটে গেল আরও একটি সপ্তাহ। এ সপ্তাহে টিনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। পেয়ে গেলাম টিনার ফেসবুক আইডির সন্ধান। টিনা আমাকে তার ফ্রেন্ডলিস্টে অ্যাড করে নেয়। এরপর সময়-অসময়ে শুরু হয় তার সঙ্গে চ্যাটিং। ধীরে ধীরে তার প্রতি আমি দুর্বল হতে লাগলাম। বুঝতে পারলাম এটা আসলে প্রেমে পড়ার-ই লক্ষণ! টিনারও কি একই অবস্থা? জানি না। তবুও ইচ্ছে হলো টিনাকে প্রপোজ করার। ফেসবুক, স্কাইপির ডিজিটাল যুগেও ঠিক করলাম এনালগ কায়দায় রঙিন খামে চিঠি লিখে টিনাকে প্রপোজ করব। যেই ভাবা সেই কাজ। বেরিয়ে পড়লাম রঙিন খাম আর প্যাডের সন্ধানে। লাইব্রেরি থেকে কিনে আনলাম সব। এরপর মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখে ফেললাম একটা চিঠি। তারপর বুকে সাহস সঞ্চয় করে চিঠিটা দিয়ে দিলাম টিনার হাতে। আমার সামনেই টিনা চিঠিটা পড়ল। পড়া শেষে কিছু না বলে চুপচাপ বাসায় চলে গেল। সে রাগ করল নাকি হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানালো, কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না।

দুই দিন পর হঠাৎ বাড়িওয়ালী এসে হাজির আমাদের বাসায়। দরজার কড়া নাড়তেই আমি দরজা খুলে ওনাকে ভেতরে আসতে বললাম। উনি জানতে চাইলেন আমার আব্বা কোথায়? বললাম, ভেতরে আছেন। এরপর তিনি আর কিছু না বলে সোজা ভেতরের রুমে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় ওনার হাতে খেয়াল করলাম সোনালি কালারের একটা খাম। তবে কি উনি আমার আব্বাকে...(!), দূর ছাই! কী ভাবছি এসব। ওনার তো স্বামী আছেনই! তাহলে হাতে এটা কিসের খাম? চুপি চুপি নজর রাখলাম ভেতরের রুমে। দেখলাম বাড়িওয়ালী আব্বার হাতে খামটা দিয়ে কী জানি সব বলছেন। এরপর তিনি চলে গেলেন। বাড়িওয়ালী আমাদের বাসা থেকে বেরিয়ে যেতেই আব্বা খাম খুলে একটা চিঠি বের করলেন। চিঠিটা পড়ে তিনি রাগত স্বরে আমাকে ডাকলেন। কাছে যাওয়ার পর বেশ কয়েকদফা ঝাড়ি ডেলিভারি দিলেন। ভাবলাম চিঠিতে বাড়িওয়ালী আব্বাকে কী এমন লিখলেন যে, আব্বা আমার ওপর ক্ষেপে গেলেন? আব্বা বকতে বকতে চিঠিটা আমার ওপর ছুঁড়ে মারলেন। ফ্লোর থেকে চিঠিটা উঠিয়ে আমি পড়া শুরু করলাম। দেখলাম তাতে বেশ সুন্দর হাতের অক্ষরে লেখা—

জনাব, 
দু’দিনের মধ্যে আপনারা আমার বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবেন। আপনার ছেলের সাহস দেখে আমি অবাক হলাম। সে আমার মেয়ে টিনাকে প্রেমপত্র লিখেছে। ব্যাপারটা শুনে টিনার প্রবাসী স্বামী প্রচণ্ড রাগ করেছে। আমার মেয়ের জামাই অনতিবিলম্বে আপনাদের এই বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিতে বলেছে। আশা করছি নিজেদের সম্মান বজায় রাখতে আপনারা দু’দিনের মধ্যেই বাড়িটি ছেড়ে চলে যাবেন। আর যদি স্বেচ্ছায় না যান তবে আপনাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য থাকব।
ইতি
আপনাদের বাড়িওয়ালী

লেখক: রবিউল ইসলাম সুমন
প্রথম প্রকাশ: ভিমরুল, আমারদেশ 
(১০ জানুয়ারি ২০১৩)

Monday, July 6, 2015

ভাষার প্রতি ভাসা প্রেম!

সকালে বন্ধু আসিফের ফোন পেয়ে ঘুম ভাঙল। ফোনটা রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে আসিফ বলে উঠল, ‘সুপ্রভাত দোস্ত।’ আসিফের মুখে ‘সুপ্রভাত’ কথাটি শুনে আমি যেন হঠাৎ আকাশ থেকে পড়লাম! কারণ যে বন্ধু জাগরণে দূরে থাক, গভীর রাতের স্বপ্নেও কোনোদিন বাংলায় কথা বলতে চায় না, তার মুখ থেকে আচমকা এরকম খাঁটি বাংলা শব্দ শুনলে চমকে যাওয়ারই কথা। যাই হোক, দেরি না করে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, কিরে, আজ হঠাৎ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের উপস্থাপকদের মতো এমন শুদ্ধ বাংলায় উইশ করলি যে? জবাবে আসিফ বলল, তুই জানিস এটা কী মাস? বললাম, হুম... জানি। এটা ফেব্রুয়ারি মাস, তাতে কী?
— তাতে কী মানে? তুই জানিস না এটা আমাদের ভাষা আন্দোলনের মাস? বলল আসিফ।
— এটাও জানি, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের মাস বলে হয়েছেটা কী?
এবার আসিফের মুখে শুনতে পেলাম রাগী একটা স্বর। সে বলতে লাগল, আরে ব্যাটা, ভাষা আন্দোলনের মাসে দেশের প্রতি আমাদের একটা কর্তব্য আছে না! যে ভাষার জন্য মানুষজন প্রাণ দিয়েছে, সেই ভাষার জন্য প্রাণ না দিই কিন্তু সব ভাষাশহীদের প্রতি কি আমরা একটু শ্রদ্ধাবোধও দেখাতে পারি না?
— অবশ্যই পারিস। কিন্তু কীভাবে দেখাবি বল?
— কেন, এই যে এভাবে? এই মাসে বেশি বেশি বাংলা ওয়ার্ড ইউজ করে!
আসিফের এমন জগাখিচুড়িমার্কা কথা শুনে যে কারোরই রাগ উঠতে পারে। আমারও উঠল। বললাম, সারা বছর ঠুসঠাস ইংরেজিতে কথা বলে কেবল একটি মাস বাংলায় কথা বলার রেওয়াজ করলেই বুঝি তা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দেখানো হয়ে যায়, তাই না রে? এবার খানিকটা চুপসে গেল আসিফ। কয়েক সেকেন্ড বিরতি নিয়ে হঠাৎ ঠাস করে বলে বসল, শালা তুই একটা রাজাকার! তোর নিজের তো ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই-ই, উল্টো আমাদের মতো তরুণ প্রজন্মের ভাষাপ্রেমীদের ওপর আক্রমণ করাটাই যেন তোর কাজ! এবার আসিফের কথায় আমি না হেসে পারলাম না! তবু আর বেশি কথা না বলে বিষয়টাকে এখানেই থামিয়ে দিলাম।
এরপর আসিফের সঙ্গে কথা শেষ করে বিছানা থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হলাম। একটু পর কলেজে যেতে হবে, তাই নাস্তার জন্য অপেক্ষা করছি। নাস্তা রেডি হতে হতে ভাবলাম, ফেসবুক থেকে একটু উঁকি মেরে আসা যাক। ব্যস, বসলাম কম্পিউটারে। ফেসবুক লগইন করামাত্রই দেখি আরেক কাণ্ড! নিজের হোমপেজ আর বন্ধুদের প্রোফাইল পিকচারজুড়ে শুধুই বাংলা বর্ণমালার বিভিন্ন অক্ষরের ছড়াছড়ি! হঠাৎ-ই বড় ধরনের কোনো অক্ষরবিপর্যয় হলো কিনা চিন্তায় পড়ে গেলাম! এমন সময় আমার এক বন্ধু অর্ণব চ্যাট বক্সে কড়া নাড়ল। তার প্রোফাইলেও দেখি বড় করে লেখা আছে বাংলা বর্ণমালার ‘অ’ বর্ণটি। তাই জিজ্ঞেস করলাম, তোর প্রোফাইলে ‘অ’ লিখে রেখেছিস ক্যান? এর মানে কী? অর্ণব বলল, ‘অ’-তে ‘অর্ণব’ মানে তার নিজেরই নাম!
— তাহলে শুধু ‘অ’ ক্যান? পুরো নাম লিখলেই তো পারিস!
— আরে না। যার নাম যে অক্ষর দিয়ে শুরু, শুধু ওই অক্ষরটি দিলেই বেশি সুন্দর লাগে!
— তাহলে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবিটা মুছে ওখানেও একটা অক্ষর ঝুলিয়ে রাখ! এতে নিজের বীভত্স চেহারাটা আর কাউকে দেখাতে হবে না, আবার দেখতেও সুন্দর লাগবে!!
— দেখ, এটা নিয়ে কোনো তামাশা করবি না। সহ্য করব না বলে দিলাম।
— আচ্ছা যা, করলাম না; কিন্তু তোরা সবাই এই অক্ষরগুলো দিয়ে কী প্রমাণ করতে চাস, এটা তো বলতে পারিস?
— প্রমাণ করতে চাই মানে? এটা হলো আমাদের মাতৃভাষা- প্রেম। বাংলাকে যে আমরা কতটা ভালোবাসি তা বিশ্বকে জানাতে হবে না!
— ও! ফেসবুক আইডিতে নিজের ছবির জায়গায় বর্ণমালার একটি অক্ষর দিয়ে রাখলেই যে এটা মাতৃভাষার প্রতি প্রেম হয়ে যায়, তা আমার জানা ছিল না!
ইতোমধ্যেই অর্ণব একটা লিংক পাঠিয়ে দিয়ে বলল, এখান থেকে তুই ও নিজের নামের প্রথম অক্ষরটা সুন্দরভাবে বানিয়ে প্রোফাইলে সেট করতে পারবি।
আমি আর কোনো রিপ্লাই না দিয়ে সোজা লগ আউট হলাম। এরপর ফেসবুক থেকে বের হয়ে সোজা কলেজের পথে পা বাড়ালাম।
কলেজে এসে প্রথমেই দেখা হয়ে গেল বন্ধু রাসেলের সঙ্গে। রাসেলের বেশভূষার দিকে নজর দিয়ে আমি অবাক না হয়ে পারলাম না! যে বন্ধু সারা বছর চুলে জেল দিয়ে ঘুরে বেড়ায়, সে কিনা আজ এসেছে খাঁটি সরিষার তেল মেখে! আবার পরনে চিরচেনা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট এবং ইংলিশ জার্সির বদলে সে পরে এসেছে সিম্পল একসেট পাঞ্জাবি-পাজামা! এখানেই শেষ নয়, দেখি তার পাঞ্জাবিতে আবার লেখা রয়েছে দেশীয় সব বর্ণমালা! আগের দুই বন্ধুর ঘটনায় বুঝতে বাকি নেই যে, রাসেলের এই পরিবর্তনের কারণও হচ্ছে ভাষার প্রতি প্রেম! তাই তাকে আর অযথা কোনো প্রশ্ন করলাম না। চুপচাপ ক্লাসে চলে গেলাম। ক্লাস শেষে দুপুরে কলেজ ক্যান্টিনে গেলাম হালকা কিছু খাওয়ার জন্য। মজার ব্যাপার হলো, বন্ধুদের মতো ক্যান্টিনের চেহারাও আজ বদলে গেছে! ক্যান্টিনে ঢুকেই আজ আর শীলা-মুন্নি বা চিকনি চামেলীর গান শুনতে হলো না। এদের পেছনে ফেলে ক্যান্টিনের টেপরেকর্ডারে বাজতে থাকল সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারের গান! ক্যান্টিন বয়কে বললাম—কী রে, ভাষা আন্দোলনের মাস বলে বুঝি আজ হিন্দি গানের বদলে পুরনো দিনের বাংলা গান বাজাচ্ছিস? বয় হেসে বলল, অ্যাগেইন জিগায় মামু! শত হইলেও এইটা ভাষার মাস। এ মাসে কি আর হিন্দি গান বাজানো যায়? এরপর আর কোনো কথা নয়। ক্যান্টিন থেকে দু’টি সিঙ্গাড়া আর এক কাপ চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
দুপুরে বাসায় ফিরেও দেখি সারাদিনের সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি! অর্থাৎ আবারও ভাষা-প্রেম। এবারের প্রেমটা আর বন্ধুদের নয়, এটা স্বয়ং আমার ভাবীর! বাসায় ফিরেই দেখতে পেলাম ভাবী তার চিরচেনা হিন্দি সিরিয়ালের বদলে বাংলা নাটক দেখছেন টিভিতে। যদিও অবাক হওয়ার কিছু নেই, তবু প্রশ্ন করে বসলাম, ভাষার মাসের কারণে বুঝি এই মাসে আর হিন্দি সিরিয়াল দেখবেন না, তাই না? ভাবী মুচকি হেসে জানান, ঠিক ধরেছিস। এ মাসে আর নো মোর হিন্দি সিরিয়াল। এখন থেকে টিভি দেখব বাংলায়, কথাও বলব বাংলায়! ভাবীর কথায় কিছুটা স্বস্তি পেলাম। কারণ তিনি হিন্দি সিরিয়াল দেখতে দেখতে হিন্দি ভাষাটাও আয়ত্ত করে ফেলেছেন। যার ফলে কথা বলার সময় বাংলা-হিন্দি মিশিয়ে তিনি এমন কিছু শব্দ বলে বসেন, যা বুঝতে গেলে আমাদের প্রায় দাঁত ভাঙার উপক্রম হয়! এ মাসের উছিলায় অন্তত কিছুদিন তার এমন উদ্ভট কথা থেকে নিস্তার পাব এটা ভেবেই স্বস্তি লাগল। এরপর ভাবীর কাছে জানতে চাইলাম, কাজের বুয়া কোথায়? সে আজ আসেনি? ভাবী বললেন, না আসেনি। তাকে কী দরকার? বললাম, চা খেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু বুয়া তো আসেনি। এখন কী করে যে খাই? এবার আমাকে অবাক করে দিয়ে ভাবী বলে উঠলেন —
‘উসকে লিয়ে টেনশান নেহি লেনেকা! ম্যায় হু না!!’
যাই হোক, ভাবীর কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে বিকেলে টিউশনিতে গেলাম এক ছাত্রীর বাসায়। সারা দিনের ঝক্কি-ঝামেলার পর এ সময়টায় নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হয়। ছাত্রীর মা শরবত তৈরি করে দিলেন খাওয়ার জন্য। সঙ্গে দিলেন বিস্কুট আর চানাচুর। হঠাৎ নিশাত (ছাত্রীর নাম) বলে উঠল, স্যার, আম্মু বলেছে আজ বেশি করে বাংলা হ্যান্ডরাইটিং করাতে। হায়! এখানেও দেখি সবার মধ্যে ভাষাপ্রেম! কী আর করা! নিশাতকে বললাম ঠিক আছে, 'বাংলা আমার মাতৃভাষা' এই লাইনটি ২০ বার লেখ। নিশাত লিখতে বসে গেল। নিশাত পড়ে ক্লাস থ্রি তে। ইংরেজিতে সে পটু হলেও বাংলায় খুবই কাঁচা। অতএব ২০ লাইন লিখতে তার মিনিমাম ১ ঘণ্টা লাগার কথা। তাই নিশাতকে লিখতে দিয়ে আমি বসে পত্রিকা পড়ছিলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে মাত্র ২০ মিনিটেই নিশাত বলল, স্যার লেখা শেষ! সব ঠিকঠাক আছে কি না চেক করার জন্য নিশাতের খাতাটা হাতে নিলাম। খাতার দিকে তাকাতেই আমার চোখ প্রায় কপালে! কারণ নিশাত 'বাংলা আমার মাতৃভাষা' কথাটি ২০ বার লিখেছে ঠিকই, কিন্তু তার লেখার ধরন ছিল এ রকম —
Bangla Amar Matri Basha...
Bangla Amar Matri Basha...
Bangla Amar Matri Basha!!!

লেখক: রবিউল ইসলাম সুমন
যৌথপ্রকাশ: ঘোড়ার ডিম, কালের কণ্ঠ (১৭ ফেব্রয়ারি ২০১৩)
ভিমরুল, আমারদেশ (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

Friday, June 26, 2015

থ্রি ইডিয়েটসগিরি!

পরীক্ষার হলে বেঞ্চে বসে নিজের অজান্তেই হেসে উঠলাম। এমন সময় খাতা দিতে আসা স্যার (পরীক্ষা পরিদর্শক) এসে বললেন -


স্যার: হাসছো কেন?
ছাত্র: ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতাম মেয়েদের পাশে বসে পরীক্ষা দিচ্ছি! ভার্সিটি লাইফে এসে আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়ে গেল, তাই মজা লাগছে। এজন্য হাসছি!
স্যার: ইডিয়েট! আগে কোনোদিন মেয়েদের পাশে আর বসোনি বুঝি?
ছাত্র (মাথা চুলকাতে চুলকাতে): ইয়ে... বসেছিলাম স্যার। ঢাকা থেকে কুমিল্লায় যাওয়ার পথে বাসে একবার এক মেয়ের পাশে বসার সুযোগ হয়েছিল!
স্যার: আজ কি পরীক্ষা তোমার?
ছাত্র: রাষ্ট্রবিজ্ঞান, স্যার।
স্যার: হুম, বলো দেখি বিজ্ঞান কি?
ছাত্র: আসলে স্যার, সহজ কথায় বলতে গেলে আমাদের চারপাশে যা আছে তাই বিজ্ঞান।
স্যার: ক্যান ইউ ইলাবোরেট প্লিজ?
ছাত্র: এই যে স্যার পরীক্ষা দিতে আসছি, ফাইলের ভেতর রাখা আছে জ্যামিতি বক্স এটা একটা বিজ্ঞান, লেখার জন্য কলম ইউজ করব এই কলমটাও বিজ্ঞান। বলতে গেলে স্যার, ফাইলের জিপ থেকে আপনার হাতে থাকা OMR শিট সবই বিজ্ঞান!
স্যার: এগুলা সব বিজ্ঞান?
ছাত্র: হুম, এক সেকেন্ড স্যার এক্সাম্পল দিচ্ছি। এই দেখুন স্যার,  OMR শিটে নাম্বার লিখছি, আর বৃত্ত ভরাট করছি। লিখছি, ভরাট করছি। লিখছি, ভরাট করছি। ডট ডট ডট!
স্যার: ফাজলামো করো? বিজ্ঞানের সংজ্ঞা কি সেটা বলো?
ছাত্র: এতোক্ষণ সংজ্ঞাই তো বললাম, স্যার। সহজ ভাষায়!
স্যার: বইয়ের ভাষায় বলো।
ছাত্র: স্যার ওইটাই তো...
স্যার (পাশের জনকে উদ্দেশ্য করে): তুমি বলো দেখি বিজ্ঞান কি?
মেয়ে: হি হি... প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিশ্বকে বোঝার জন্য প্রমাণ নির্ভর নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে জ্ঞানের অনুসন্ধানই বিজ্ঞান স্যার।
স্যার: বাহ! কি সুন্দর সংজ্ঞা!
ছাত্র: কিন্তু স্যার, আমিও তো একই কথা বলেছিলাম সহজ ভাষায়!
স্যার: শাটআপ...
ছাত্র: স্যরি স্যার?
স্যার: সহজ ভাষায় সংজ্ঞা বলতে হলে বাইরে গিয়ে অন্য কারো সামনে বলবে, আমার স্যামনে নয়! বুঝছ? যাও এখন বাইরে চলে যাও।
ছাত্র: ওকে, স্যার যাচ্ছি...

কিছুক্ষন পর...
স্যার: একি! আবার ফিরে আসছো যে?
ছাত্র: কিছু একটা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, স্যার।
স্যার: কি সেটা?
ছাত্র: Science is a branch of knowledge or study dealing with a body of facts or truths systematically arranged and showing the operations of general laws.
স্যার: মানে কি?
ছাত্র: মানে প্রবেশপত্র, স্যার! প্রবেশপত্রটা নিতে ভুলে গিয়েছিলাম! নিয়ে যাব?
স্যার: সংজ্ঞা জানো সেটা আগে বললেই পারতে! এতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলার কি দরকার ছিল!
ছাত্র: একটু আগে তো সহজ করে বলতে চাইলাম! আপনি সুযোগ দিলেন কই?!!
স্যার: যাও তোমার সিটে বসে সুন্দর করে পরীক্ষা দাও গিয়ে...
ছাত্র: ধন্যবাদ, স্যার!

লেখা ও আঁকা: রবিউল ইসলাম সুমন
প্রথম প্রকাশ: প্যাঁচআল, দৈনিক সমকাল
(৮ জুন ২০১৫)

ছাতার ব্যতিক্রমী ব্যবহার!

ছাতা যে আপনাকে শুধু রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দেয় তা কিন্তু নয়। এর বাইরেও রয়েছে ছাতার বহুমুখী ব্যবহার। তো আর কি কি কাজে ছাতাকে ব্যবহার করা যায় চলুন দেখে আসি -


আইডিয়া: শামছুল হক রাসেল, আঁকা: রবিউল ইসলাম সুমন
প্রথম প্রকাশ: রকমারি রম্য, বাংলাদেশ প্রতিদিন
(৮ জুন ২০১৫)

Thursday, June 25, 2015

আপনারা/ তোমরা/ তোরা যারা পত্রিকায় লিখতে আগ্রহী...

প্রায় ইনবক্সে শুনতে হয়, ভাই ওমুক পত্রিকায় কিভাবে লিখব? ওমুক পত্রিকার সম্পাদক জানি কে? আচ্ছা লেখা পাঠানোর ঠিকানাটা কি? লেখা কি পত্রিকার ঠিকানায় পাঠাব নাকি সম্পাদকের নিজস্ব মেইলে? লেখা পাঠানোর আগে কি সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করে নিতে হবে? ভাল খাতির না থাকলে লেখা ছাপবে তো? ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন। প্রত্যেককে একই উত্তর দিতে দিতে প্রায় টায়ার্ড হতে হয়, কখনো বা শিকার হতে হয় ভুল বুঝাবুঝির। তাই ভাবলাম এটা নিয়ে একটা নোট লিখে রাখা যাক। যেহেতু আমি ফান ম্যাগাজিনের সাথে জড়িত তাই কেবল ফান ম্যাগাজিন সম্পর্কেই এখানে লিখতে পারব। তো শুরু করার আগে একটু জ্ঞানগর্দব কথা বলা নেয়া যাক-


** কোনো পত্রিকায় (ম্যাগাজিনে) লিখতে হলে সেই ম্যাগাজিন সম্পর্কে আপনার নূন্যতম জ্ঞান থাকা লাগবে। অন্যথায় লেখালেখির চেষ্টা না করাই ভাল। কারণ ক্লাস ওয়ান সম্পর্কে ধারনা না থাকলে আপনি অনার্স-মাষ্টার্সে ভর্তি হবেন ক্যামনে? যাই হোক, ম্যাগাজিন সম্পর্কে জ্ঞান নিতে হলে কবে কোন পত্রিকার সাথে কোন ম্যাগাজিন বের হয় এটা খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য এক সপ্তাহ একটা পত্রিকায় নজর রাখলেই যথেষ্ট। এখন অনলাইনেই সব পত্রিকা পাওয়া যায়। তাই কষ্ট করে প্রত্রিকা সংগ্রহের ও দরকার নেই। একঘন্টা ওয়েবসাইট ঘাটলেই সব পত্রিকার খবরাখবর নিতে পারবেন। তাই এ বিষয়ে আর কথা বাড়ালাম না।

*** এখন আসি লেখা সম্পাদকের পার্সোনাল মেইলে মেইলে পাঠাবেন নাকি পত্রিকার সাথে দেয়া মেইলে এর উত্তরে। লেখা অবশ্যই পত্রিকায় দেয়া মেইলে পাঠাবেন। কারণ ওই মেইলটা খোলাই হয় পত্রিকার লেখা গ্রহনের জন্য। পার্সোনাল মেইলটা সবাই পার্সোনাল রাখতেই ভালবাসে। আপনি যদি কোনো সম্পাদকের আস্থা অর্জন করতে পারেন তখন না হয় পার্সোনাল মেইল এড্রেস চেয়ে নিবেন। পার্সোনাল মেইল আইডিটা সাধারনত লেখালেখির দ্বিতীয় ধাপে অনুসরিত হয়। আর তাছাড়া হাতেগোণা দুয়েকটা পত্রিকা ছাড়া বাকি সবাই পত্রিকার সাথে দেয়া মেইল আইডিটাই ইউজ করে। তাই ওই আইডিতেই লেখা পাঠানোই উত্তম।

** লেখা পাঠানোর আগে সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ বা এক্সট্রা খাতিরের কোনো দরকার নেই। আপনার লেখার মান যদি ভাল হয় তবে আপনি লেখাটা ছাপার অক্ষরে দেখার জন্য যতোটা আগ্রহী তারচেয়ে সম্পাদকেরাই বেশি আগ্রহী থাকবে আপনার লেখাটা ছাপতে। এক্সট্রা খাতির বিষয়টা মূলত আপনার লেখার মানহীনতার বহিঃপ্রকাশ।


** এবার জানা যাক কিভাবে লেখা পাঠাবেন এর উত্তর। লেখা ডাকযোগে বা ইমেইলের মাধ্যমে পাঠাতে পারবেন। তবে এখন যেহেতু অনলাইনের প্রচলনটাই বেশি তাই লেখা ইমেইলে পাঠানোটাই ভাল মনে করছি। লেখা পাঠাতে হলে ইমেইলে গিয়ে মেইল সেন্ডারের ঠিকানার জায়গায় পত্রিকার মেইল এড্রেসটি টাইপ করুন। সাবজেক্টে লিখুন আপনার লেখার নাম বা কোন বিভাগে লেখাটি পাঠাতে চাচ্ছেন তার নাম। এরপর মেইল কম্পোজের ঘরে শুরুতে লেখার শিরোনামটি লিখে তারপর পুরো লেখাটি লিখে সেন্ড করে দিতে পারেন। তবে সবচেয়ে ভালো হয় লেখাটি MS Word এ লিখে ইমেইলে Attach File হিসেবে পাঠিয়ে দিলে। আর এক্ষেত্রে লেখার ফন্ট SutonnyMJ রাখাটাই উত্তম। কারণ পত্রিকার অফিসে ইউনিকোড টাইপের ফন্ট ইউজ প্রায় হয় না বললেই চলে। নিচে ইমেইল আর ওয়ার্ড ফাইলে কিভাবে লেখা হয় তার একটি স্ক্রীনশট দিলাম।
ই-মেইল স্যাম্পল
ওয়ার্ড ফাইলের স্যাম্পল
তো অনেক কথা বলে ফেললাম। এবার নিচে একনজরে কয়েকটি পত্রিকার ফান ম্যাগাজিনের নাম ও ঠিকানা জেনে নেয়া যাক তাহলে-

ঠাট্টা
ছাপা হয়: দৈনিক ইত্তেফাক থেকে
সম্পাদনায়: সাইফুল ইসলাম জুয়েল
প্রকাশের দিন: রবিবার
ইমেইল: ittefaq.thatta@gmail.com

রস+আলো
ছাপা হয়: দৈনিক প্রথম আলো থেকে
সম্পাদনায়: সিমু নাসের/ মাহফুজ রহমান
প্রকাশের দিন: সোমবার
ইমেইল: ra@prothom-alo.info

রকমারি রম্য
ছাপা হয়: বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে
সম্পাদনায়: তানভীর আহমেদ
প্রকাশের দিন: সোমবার
ইমেইল: rokorommo@gmail.com

প্যাঁচআল
ছাপা হয়: দৈনিক সমকাল থেকে
সম্পাদনায়: ইমন চৌধুরী
প্রকাশের দিন: সোমবার
ইমেইল: pachaal123@gmail.com

ঘোড়ার ডিম
ছাপা হয়: দৈনিক কালের কণ্ঠ থেকে
সম্পাদনায়: মেহেদী আল মাহমুদ
প্রকাশের দিন: মঙ্গলবার
ইমেইল: ghorardim@kalerkantho.com

অ্যান্টিভাইরাস
ছাপা হয়: দৈনিক আমাদের সময় থেকে
সম্পাদনায়: ইশতিয়াক আহমেদ
প্রকাশের দিন: মঙ্গলবার
ইমেইল: _

থেরাপি
ছাপা হয়: দৈনিক নয়াদিগন্ত থেকে
সম্পাদনায়: সোহেল অটল
প্রকাশের দিন: বৃহষ্পতিবার
ইমেইল: therapy@dailynayadiganta.com


বি:দ্র: লেখালেখি করতে হলে যে জিনিসটি অবশ্যই মনে রাখতে হবে তা হলো-
♦ একই লেখা কখনো একাধিক প্রত্রিকায় পাঠানো যাবে না।
♦ কোনো পত্রিকায় লেখা পাঠালে তা যদি না ছাপে তবে কমপক্ষে ৩মাস অপেক্ষা করে লেখাটি অন্য পত্রিকায় পাঠানো যাবে।
♦ অনলাইন থেকে কপিকৃত লেখা নিজের নামে লিখে পত্রিকায় পাঠানো যাবে না।