Showing posts with label রম্যগল্প. Show all posts
Showing posts with label রম্যগল্প. Show all posts

Monday, February 29, 2016

বইমেলা এবং আমি!


মি লেখালেখি খুব একটা করি না। আর যদি করি তবে কোনো সম্পাদকই আমাকে পাত্তা দেয় না! মানে কেউই লেখা ছাপতে চায় না আর কি! তাই বলে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র আমি নই। আশায় বুক আর নিরাশায় মুখ ফুলিয়ে লিখেই চলেছি একের পর এক বাতিল লেখা। একদিন আমার বন্ধু রাসেল আইডিয়া দিল লেখাগুলোকে আলোর মুখ দেখানোর জন্য। আইডিয়াটা হলো নিজের লেখাগুলোকে একসঙ্গে জড়ো করে একটা বই বের করতে হবে। রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু কে ছাপবে আমার বই? বড়ই টেনশনিত ব্যাপার! সমাধানও পেয়ে গেলাম। নিজের লেখাগুলোকে স্ট্যাপলারের পিন মেরে মেরে তৈরি করে ফেললাম আস্ত একটা পাণ্ডুলিপি। এরপর পাণ্ডুলিপি সমেত রওনা দিলাম বাংলাবাজারের দিকে। শুনেছি সেখানে অনেক প্রকাশক নতুন লেখকদের বই বের করার জন্য আশায় বুক বেঁধে রাখে। তাই তাদের আশার ওপর ভরসা রেখে পাণ্ডুলিপি নিয়ে হাজির হলাম বাংলাবাজারে। কিন্তু হায়... এখানে এসে জানতে পারলাম, কোনো প্রকাশকই টাকা ছাড়া বই ছাপাবে না! তাই আমার আশার গুড়ে এখন বালু পড়ার অবস্থা! অবশেষে এক প্রকাশককে অনেক বলে-কয়ে বিনা পয়সায় একটা বই বের করতে রাজি করাতে পারলাম। প্রকাশকের হাতে পাণ্ডুলিপি তুলে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হলাম যে, এবারের বইমেলায় আমারও একটা বই থাকছে। অতএব আমার নেক্সট স্টেপ হচ্ছে বইটা যেন চলে তার জন্য একটু আধটু প্রচার-প্রচারণা করা। ব্যস, নেমে পড়লাম প্রচারণার কাজে।

দেখতে দেখতে চলে এলো বইমেলা। আর এদিকে বই নিয়ে আমার প্রচারণা ছিল তুঙ্গে! শহরের মোড় থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা অলিগলিতেও নিজের বইয়ের পোস্টার, লিফলেট টানিয়ে দিলাম। আর পরিচিতদের হাতে তুলে দিতে লাগলাম বইয়ের সৌজন্যে একটা করে ক্যালেন্ডার একদম ফ্রিতে! এখন আমি নিজ এলাকার একজন টপ তারকাখ্যাতি সম্পন্ন লেখক। রাজনৈতিক নেতাদের মতো দেয়াল দখল করে পোস্টারিং করার কারণে আমার নাম আর ফেইস মহল্লার পোলাপান থেকে শুরু করে বুড়ো নানা-দাদারাও জানে। আর বন্ধুরা তো অলরেডি আমাকে লেখক ছাড়া অন্য কোনো নামে ডাকেই না! সেই সঙ্গে বন্ধুরা আশ্বস্ত করল যে, তারা সবাই আমার বইটা কিনবে। কিন্তু শর্ত হলো বই কেনার আগে সবাইকে একবেলা খাওয়াতে হবে। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। ঠিক করলাম মেলায় যাওয়ার আগে সবাই মিলে একটা হোটেলে খাব অ্যান্ড দ্যান একসঙ্গে বইটা কিনব।

কথামতো বন্ধুরা সবাই একদিন চলে গেলাম বইমেলায়। প্রথমে সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া করলাম একটা রেস্টুরেন্টে। এরপর গেলাম বাংলা একাডেমিতে। বইমেলায় ঢুকে সরাসরি চলে গেলাম নিজের বই যে প্রকাশনী থেকে বের হওয়ার কথা তার স্টলে। সেখানে গিয়ে অনেক খুঁজেও ডিসপ্লেতে নিজের বইটা না পেয়ে অবশেষে সেলসম্যানদের হেল্প নিলাম। বইয়ের নাম বলতেই তারা স্টলের এক কোনা থেকে বইটা বের করে আনলেন। এরপর বইটা তুলে দিলাম সবার হাতে। বই হাতে পেয়ে বন্ধুরা সবাই প্রায় বিস্মিত! আর আমি বিস্মিত ওদের চেয়ে ডাবল! কারণ বইয়ে লেখকের জায়গায় আমার নামের বদলে ছিল অন্য আরেকটি নাম। আর সেই নামটি হলো প্রকাশকের নিজের!

লেখা ও আঁকা: রবিউল ইসলাম সুমন
প্রথম প্রকাশ: প্যাঁচআলদৈনিক সমকাল
(২২ ফেব্রয়ারি ২০১৬)

Tuesday, July 7, 2015

বাড়িওয়ালীর কাছ থেকে পাওয়া প্রথম পত্র!


বাড়িওয়ালার মেয়েদের প্রতি সবারই কম-বেশি আগ্রহ থাকে। আমারও যে আগ্রহ নেই, এটাই বা বলি কী করে! আর বাড়িওয়ালাটি যদি হয় ঢাকা কিংবা তার আশপাশের কোনো এলাকার এবং তার মেয়েটিও যদি হয় হালকা-পাতলা সুন্দরী টাইপের, তবে তো কোনো কথাই নেই!

আমার আব্বা একজন সরকারি কর্মচারী। কাজের জন্য তাকে প্রতি বছরই এ অঞ্চল থেকে ও অঞ্চলে বদলি হয়ে যেতে হয়। আর আব্বার অঞ্চল বদল মানেই আমাদেরও বাসা বদলের লক্ষণ! প্রায় প্রতি বছরই আমরা নতুন বাড়ি এবং বাড়িওয়ালার সান্নিধ্য পাই। ভাগ্যগুণে এ বছর পেয়ে গেলাম এক বাড়িওয়ালীর সান্নিধ্য! বাড়িওয়ালা থাকেন দেশের বাইরে। আর তাই আমরা এ বছর যে নতুন বাড়িতে উঠেছি, তার দেখাশোনার পুরোপুরি দায়িত্ব বাড়িওয়ালার স্ত্রী ওরফে বাড়িওয়ালীর কাঁধে। আব্বার মুখে শুনেছি, বাড়িওয়ালীর কাজে হেল্প করার জন্য হেল্পার হিসেবে আছেন তারই দুই মেয়ে। তো নতুন বাড়ি, বাড়িওয়ালী আর তার দুই মেয়ের মুখ দর্শনে আশা করছি এবারের বছরটা আমাদের ভালোই কাটবে।

যাই হোক, মাসের ১ তারিখে নিজেদের সহায়-সম্বল আর শীতের লেপ-কম্বল যা ছিল তাই নিয়ে উঠে গেলাম নতুন বাসায়। ফ্যামিলির বড় ছেলে হিসেবে আমার কাঁধে অলওয়েজ ম্যালা দায়-দায়িত্ব থাকে। এই যেমন কোথাও বাসা পাল্টালে বাসার মালপত্র সব নিজের কাঁধে করে বহন আর জিনিসপত্রগুলো ঠিকঠাকমতো সাজানো-গোছানো করা আর কি! আমাদের এবারের বাসাটি ভাড়া করা হলো চারতলায়। তিনতলায় থাকেন বাড়িওয়ালী এবং ওনার মেয়েরা। তো মালামাল নিয়ে ওপরে ওঠার সময় হঠাৎ মৃদু হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। আশপাশে তাকিয়ে দেখি তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুন্দরী এক মেয়ে আমাকে দেখে হাসছে। বুঝতে পারলাম তিনি আমাদের বাড়িওয়ালীরই মেয়ে। তবে মেয়েটি কেন আমাকে দেখে হাসলো এটা বোঝার সামর্থ্য আপাতত হলো না। বাসায় মালামাল সব ওঠানোর পর আব্বা, আম্মা, আমি আর ছোট ভাইবোন সবাই মিলে জিনিসপত্র সব গোছাতে লাগলাম। এমন সময় বারান্দায় দেখা সেই মেয়েটি এলো আমাদের জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে। বলল, আপনারা নতুন এসেছেন। এখনও হয়তো সম্পূর্ণ মালামাল গোছাতে আর রান্নার চুলা বসাতে পারেননি। তাই আম্মু আপনাদের জন্য দুপুরের খাবার পাঠিয়েছেন। আমার আম্মা মেয়েটির হাত থেকে খাবারগুলো নিয়ে টেবিলে রাখলেন এবং তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় করলেন। খাবার খেয়ে আমরা আবারও জিনিসপত্র গোছানোর কাজে নেমে পড়লাম এবং বিকালের মধ্যেই সবকিছু ঠিকঠাক জায়গামতো গুছিয়ে রাখতে সক্ষম হলাম।

দেখতে দেখতে নতুন বাসায় কেটে গেল আমাদের পুরো একটি সপ্তাহ। এর মধ্যেই প্রতিবেশী বাড়িওয়ালী এবং তার মেয়েদের সঙ্গে আমাদের ভালো সখ্যতা হয়ে গেল। বাড়িওয়ালীর ছোট মেয়েটির নাম টিনা। সেই আমাদের খাবার নিয়ে এসেছিল এবং আমাকে প্রথম দেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হেসেছিল। আম্মার মুখে শুনলাম, বাড়িওয়ালীর বড় মেয়েটি বিবাহিত এবং তার দু’টি সন্তানও নাকি আছে। আর ছোট মেয়েটি পড়ে ভার্সিটিতে। তার ব্যাপারে খুব একটা ইনফরমেশন পাওয়া গেল না। আমিও ভার্সিটির স্টুডেন্ট। অতএব টিনার সঙ্গে একটা রিলেশন করতে পারলে মন্দ হয় না!

কেটে গেল আরও একটি সপ্তাহ। এ সপ্তাহে টিনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। পেয়ে গেলাম টিনার ফেসবুক আইডির সন্ধান। টিনা আমাকে তার ফ্রেন্ডলিস্টে অ্যাড করে নেয়। এরপর সময়-অসময়ে শুরু হয় তার সঙ্গে চ্যাটিং। ধীরে ধীরে তার প্রতি আমি দুর্বল হতে লাগলাম। বুঝতে পারলাম এটা আসলে প্রেমে পড়ার-ই লক্ষণ! টিনারও কি একই অবস্থা? জানি না। তবুও ইচ্ছে হলো টিনাকে প্রপোজ করার। ফেসবুক, স্কাইপির ডিজিটাল যুগেও ঠিক করলাম এনালগ কায়দায় রঙিন খামে চিঠি লিখে টিনাকে প্রপোজ করব। যেই ভাবা সেই কাজ। বেরিয়ে পড়লাম রঙিন খাম আর প্যাডের সন্ধানে। লাইব্রেরি থেকে কিনে আনলাম সব। এরপর মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখে ফেললাম একটা চিঠি। তারপর বুকে সাহস সঞ্চয় করে চিঠিটা দিয়ে দিলাম টিনার হাতে। আমার সামনেই টিনা চিঠিটা পড়ল। পড়া শেষে কিছু না বলে চুপচাপ বাসায় চলে গেল। সে রাগ করল নাকি হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানালো, কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না।

দুই দিন পর হঠাৎ বাড়িওয়ালী এসে হাজির আমাদের বাসায়। দরজার কড়া নাড়তেই আমি দরজা খুলে ওনাকে ভেতরে আসতে বললাম। উনি জানতে চাইলেন আমার আব্বা কোথায়? বললাম, ভেতরে আছেন। এরপর তিনি আর কিছু না বলে সোজা ভেতরের রুমে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় ওনার হাতে খেয়াল করলাম সোনালি কালারের একটা খাম। তবে কি উনি আমার আব্বাকে...(!), দূর ছাই! কী ভাবছি এসব। ওনার তো স্বামী আছেনই! তাহলে হাতে এটা কিসের খাম? চুপি চুপি নজর রাখলাম ভেতরের রুমে। দেখলাম বাড়িওয়ালী আব্বার হাতে খামটা দিয়ে কী জানি সব বলছেন। এরপর তিনি চলে গেলেন। বাড়িওয়ালী আমাদের বাসা থেকে বেরিয়ে যেতেই আব্বা খাম খুলে একটা চিঠি বের করলেন। চিঠিটা পড়ে তিনি রাগত স্বরে আমাকে ডাকলেন। কাছে যাওয়ার পর বেশ কয়েকদফা ঝাড়ি ডেলিভারি দিলেন। ভাবলাম চিঠিতে বাড়িওয়ালী আব্বাকে কী এমন লিখলেন যে, আব্বা আমার ওপর ক্ষেপে গেলেন? আব্বা বকতে বকতে চিঠিটা আমার ওপর ছুঁড়ে মারলেন। ফ্লোর থেকে চিঠিটা উঠিয়ে আমি পড়া শুরু করলাম। দেখলাম তাতে বেশ সুন্দর হাতের অক্ষরে লেখা—

জনাব, 
দু’দিনের মধ্যে আপনারা আমার বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবেন। আপনার ছেলের সাহস দেখে আমি অবাক হলাম। সে আমার মেয়ে টিনাকে প্রেমপত্র লিখেছে। ব্যাপারটা শুনে টিনার প্রবাসী স্বামী প্রচণ্ড রাগ করেছে। আমার মেয়ের জামাই অনতিবিলম্বে আপনাদের এই বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিতে বলেছে। আশা করছি নিজেদের সম্মান বজায় রাখতে আপনারা দু’দিনের মধ্যেই বাড়িটি ছেড়ে চলে যাবেন। আর যদি স্বেচ্ছায় না যান তবে আপনাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য থাকব।
ইতি
আপনাদের বাড়িওয়ালী

লেখক: রবিউল ইসলাম সুমন
প্রথম প্রকাশ: ভিমরুল, আমারদেশ 
(১০ জানুয়ারি ২০১৩)

Monday, July 6, 2015

ভাষার প্রতি ভাসা প্রেম!

কালে বন্ধু আসিফের ফোন পেয়ে ঘুম ভাঙল। ফোনটা রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে আসিফ বলে উঠল, ‘সুপ্রভাত দোস্ত।’ আসিফের মুখে ‘সুপ্রভাত’ কথাটি শুনে আমি যেন হঠাৎ আকাশ থেকে পড়লাম! কারণ যে বন্ধু জাগরণে দূরে থাক, গভীর রাতের স্বপ্নেও কোনোদিন বাংলায় কথা বলতে চায় না, তার মুখ থেকে আচমকা এরকম খাঁটি বাংলা শব্দ শুনলে চমকে যাওয়ারই কথা। যাই হোক, দেরি না করে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, কিরে, আজ হঠাৎ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের উপস্থাপকদের মতো এমন শুদ্ধ বাংলায় উইশ করলি যে? জবাবে আসিফ বলল, তুই জানিস এটা কী মাস? বললাম, হুম... জানি। এটা ফেব্রুয়ারি মাস, তাতে কী?
— তাতে কী মানে? তুই জানিস না এটা আমাদের ভাষা আন্দোলনের মাস? বলল আসিফ।
— এটাও জানি, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের মাস বলে হয়েছেটা কী?
এবার আসিফের মুখে শুনতে পেলাম রাগী একটা স্বর। সে বলতে লাগল, আরে ব্যাটা, ভাষা আন্দোলনের মাসে দেশের প্রতি আমাদের একটা কর্তব্য আছে না! যে ভাষার জন্য মানুষজন প্রাণ দিয়েছে, সেই ভাষার জন্য প্রাণ না দিই কিন্তু সব ভাষাশহীদের প্রতি কি আমরা একটু শ্রদ্ধাবোধও দেখাতে পারি না?
— অবশ্যই পারিস। কিন্তু কীভাবে দেখাবি বল?
— কেন, এই যে এভাবে? এই মাসে বেশি বেশি বাংলা ওয়ার্ড ইউজ করে!
আসিফের এমন জগাখিচুড়িমার্কা কথা শুনে যে কারোরই রাগ উঠতে পারে। আমারও উঠল। বললাম, সারা বছর ঠুসঠাস ইংরেজিতে কথা বলে কেবল একটি মাস বাংলায় কথা বলার রেওয়াজ করলেই বুঝি তা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দেখানো হয়ে যায়, তাই না রে? এবার খানিকটা চুপসে গেল আসিফ। কয়েক সেকেন্ড বিরতি নিয়ে হঠাৎ ঠাস করে বলে বসল, শালা তুই একটা রাজাকার! তোর নিজের তো ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই-ই, উল্টো আমাদের মতো তরুণ প্রজন্মের ভাষাপ্রেমীদের ওপর আক্রমণ করাটাই যেন তোর কাজ! এবার আসিফের কথায় আমি না হেসে পারলাম না! তবু আর বেশি কথা না বলে বিষয়টাকে এখানেই থামিয়ে দিলাম।
এরপর আসিফের সঙ্গে কথা শেষ করে বিছানা থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হলাম। একটু পর কলেজে যেতে হবে, তাই নাস্তার জন্য অপেক্ষা করছি। নাস্তা রেডি হতে হতে ভাবলাম, ফেসবুক থেকে একটু উঁকি মেরে আসা যাক। ব্যস, বসলাম কম্পিউটারে। ফেসবুক লগইন করামাত্রই দেখি আরেক কাণ্ড! নিজের হোমপেজ আর বন্ধুদের প্রোফাইল পিকচারজুড়ে শুধুই বাংলা বর্ণমালার বিভিন্ন অক্ষরের ছড়াছড়ি! হঠাৎ-ই বড় ধরনের কোনো অক্ষরবিপর্যয় হলো কিনা চিন্তায় পড়ে গেলাম! এমন সময় আমার এক বন্ধু অর্ণব চ্যাট বক্সে কড়া নাড়ল। তার প্রোফাইলেও দেখি বড় করে লেখা আছে বাংলা বর্ণমালার ‘অ’ বর্ণটি। তাই জিজ্ঞেস করলাম, তোর প্রোফাইলে ‘অ’ লিখে রেখেছিস ক্যান? এর মানে কী? অর্ণব বলল, ‘অ’-তে ‘অর্ণব’ মানে তার নিজেরই নাম!
— তাহলে শুধু ‘অ’ ক্যান? পুরো নাম লিখলেই তো পারিস!
— আরে না। যার নাম যে অক্ষর দিয়ে শুরু, শুধু ওই অক্ষরটি দিলেই বেশি সুন্দর লাগে!
— তাহলে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবিটা মুছে ওখানেও একটা অক্ষর ঝুলিয়ে রাখ! এতে নিজের বীভত্স চেহারাটা আর কাউকে দেখাতে হবে না, আবার দেখতেও সুন্দর লাগবে!!
— দেখ, এটা নিয়ে কোনো তামাশা করবি না। সহ্য করব না বলে দিলাম।
— আচ্ছা যা, করলাম না; কিন্তু তোরা সবাই এই অক্ষরগুলো দিয়ে কী প্রমাণ করতে চাস, এটা তো বলতে পারিস?
— প্রমাণ করতে চাই মানে? এটা হলো আমাদের মাতৃভাষা- প্রেম। বাংলাকে যে আমরা কতটা ভালোবাসি তা বিশ্বকে জানাতে হবে না!
— ও! ফেসবুক আইডিতে নিজের ছবির জায়গায় বর্ণমালার একটি অক্ষর দিয়ে রাখলেই যে এটা মাতৃভাষার প্রতি প্রেম হয়ে যায়, তা আমার জানা ছিল না!
ইতোমধ্যেই অর্ণব একটা লিংক পাঠিয়ে দিয়ে বলল, এখান থেকে তুই ও নিজের নামের প্রথম অক্ষরটা সুন্দরভাবে বানিয়ে প্রোফাইলে সেট করতে পারবি।
আমি আর কোনো রিপ্লাই না দিয়ে সোজা লগ আউট হলাম। এরপর ফেসবুক থেকে বের হয়ে সোজা কলেজের পথে পা বাড়ালাম।
কলেজে এসে প্রথমেই দেখা হয়ে গেল বন্ধু রাসেলের সঙ্গে। রাসেলের বেশভূষার দিকে নজর দিয়ে আমি অবাক না হয়ে পারলাম না! যে বন্ধু সারা বছর চুলে জেল দিয়ে ঘুরে বেড়ায়, সে কিনা আজ এসেছে খাঁটি সরিষার তেল মেখে! আবার পরনে চিরচেনা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট এবং ইংলিশ জার্সির বদলে সে পরে এসেছে সিম্পল একসেট পাঞ্জাবি-পাজামা! এখানেই শেষ নয়, দেখি তার পাঞ্জাবিতে আবার লেখা রয়েছে দেশীয় সব বর্ণমালা! আগের দুই বন্ধুর ঘটনায় বুঝতে বাকি নেই যে, রাসেলের এই পরিবর্তনের কারণও হচ্ছে ভাষার প্রতি প্রেম! তাই তাকে আর অযথা কোনো প্রশ্ন করলাম না। চুপচাপ ক্লাসে চলে গেলাম। ক্লাস শেষে দুপুরে কলেজ ক্যান্টিনে গেলাম হালকা কিছু খাওয়ার জন্য। মজার ব্যাপার হলো, বন্ধুদের মতো ক্যান্টিনের চেহারাও আজ বদলে গেছে! ক্যান্টিনে ঢুকেই আজ আর শীলা-মুন্নি বা চিকনি চামেলীর গান শুনতে হলো না। এদের পেছনে ফেলে ক্যান্টিনের টেপরেকর্ডারে বাজতে থাকল সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারের গান! ক্যান্টিন বয়কে বললাম—কী রে, ভাষা আন্দোলনের মাস বলে বুঝি আজ হিন্দি গানের বদলে পুরনো দিনের বাংলা গান বাজাচ্ছিস? বয় হেসে বলল, অ্যাগেইন জিগায় মামু! শত হইলেও এইটা ভাষার মাস। এ মাসে কি আর হিন্দি গান বাজানো যায়? এরপর আর কোনো কথা নয়। ক্যান্টিন থেকে দু’টি সিঙ্গাড়া আর এক কাপ চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
দুপুরে বাসায় ফিরেও দেখি সারাদিনের সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি! অর্থাৎ আবারও ভাষা-প্রেম। এবারের প্রেমটা আর বন্ধুদের নয়, এটা স্বয়ং আমার ভাবীর! বাসায় ফিরেই দেখতে পেলাম ভাবী তার চিরচেনা হিন্দি সিরিয়ালের বদলে বাংলা নাটক দেখছেন টিভিতে। যদিও অবাক হওয়ার কিছু নেই, তবু প্রশ্ন করে বসলাম, ভাষার মাসের কারণে বুঝি এই মাসে আর হিন্দি সিরিয়াল দেখবেন না, তাই না? ভাবী মুচকি হেসে জানান, ঠিক ধরেছিস। এ মাসে আর নো মোর হিন্দি সিরিয়াল। এখন থেকে টিভি দেখব বাংলায়, কথাও বলব বাংলায়! ভাবীর কথায় কিছুটা স্বস্তি পেলাম। কারণ তিনি হিন্দি সিরিয়াল দেখতে দেখতে হিন্দি ভাষাটাও আয়ত্ত করে ফেলেছেন। যার ফলে কথা বলার সময় বাংলা-হিন্দি মিশিয়ে তিনি এমন কিছু শব্দ বলে বসেন, যা বুঝতে গেলে আমাদের প্রায় দাঁত ভাঙার উপক্রম হয়! এ মাসের উছিলায় অন্তত কিছুদিন তার এমন উদ্ভট কথা থেকে নিস্তার পাব এটা ভেবেই স্বস্তি লাগল। এরপর ভাবীর কাছে জানতে চাইলাম, কাজের বুয়া কোথায়? সে আজ আসেনি? ভাবী বললেন, না আসেনি। তাকে কী দরকার? বললাম, চা খেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু বুয়া তো আসেনি। এখন কী করে যে খাই? এবার আমাকে অবাক করে দিয়ে ভাবী বলে উঠলেন —
‘উসকে লিয়ে টেনশান নেহি লেনেকা! ম্যায় হু না!!’
যাই হোক, ভাবীর কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে বিকেলে টিউশনিতে গেলাম এক ছাত্রীর বাসায়। সারা দিনের ঝক্কি-ঝামেলার পর এ সময়টায় নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হয়। ছাত্রীর মা শরবত তৈরি করে দিলেন খাওয়ার জন্য। সঙ্গে দিলেন বিস্কুট আর চানাচুর। হঠাৎ নিশাত (ছাত্রীর নাম) বলে উঠল, স্যার, আম্মু বলেছে আজ বেশি করে বাংলা হ্যান্ডরাইটিং করাতে। হায়! এখানেও দেখি সবার মধ্যে ভাষাপ্রেম! কী আর করা! নিশাতকে বললাম ঠিক আছে, 'বাংলা আমার মাতৃভাষা' এই লাইনটি ২০ বার লেখ। নিশাত লিখতে বসে গেল। নিশাত পড়ে ক্লাস থ্রি তে। ইংরেজিতে সে পটু হলেও বাংলায় খুবই কাঁচা। অতএব ২০ লাইন লিখতে তার মিনিমাম ১ ঘণ্টা লাগার কথা। তাই নিশাতকে লিখতে দিয়ে আমি বসে পত্রিকা পড়ছিলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে মাত্র ২০ মিনিটেই নিশাত বলল, স্যার লেখা শেষ! সব ঠিকঠাক আছে কি না চেক করার জন্য নিশাতের খাতাটা হাতে নিলাম। খাতার দিকে তাকাতেই আমার চোখ প্রায় কপালে! কারণ নিশাত 'বাংলা আমার মাতৃভাষা' কথাটি ২০ বার লিখেছে ঠিকই, কিন্তু তার লেখার ধরন ছিল এ রকম 
Bangla Amar Matri Basha...
Bangla Amar Matri Basha...
Bangla Amar Matri Basha!!!

লেখক: রবিউল ইসলাম সুমন
যৌথপ্রকাশ: ঘোড়ার ডিম, কালের কণ্ঠ (১৭ ফেব্রয়ারি ২০১৩)
ভিমরুল, আমারদেশ (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

Friday, June 26, 2015

থ্রি ইডিয়েটসগিরি!

পরীক্ষার হলে বেঞ্চে বসে নিজের অজান্তেই হেসে উঠলাম এমন সময় খাতা দিতে আসা স্যার (পরীক্ষা পরিদর্শক) এসে বললেন -


স্যার: হাসছো কেন?
ছাত্র: ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতাম মেয়েদের পাশে বসে পরীক্ষা দিচ্ছি! ভার্সিটি লাইফে এসে আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়ে গেল, তাই মজা লাগছে। এজন্য হাসছি!
স্যার: ইডিয়েট! আগে কোনোদিন মেয়েদের পাশে আর বসোনি বুঝি?
ছাত্র (মাথা চুলকাতে চুলকাতে): ইয়ে... বসেছিলাম স্যার ঢাকা থেকে কুমিল্লায় যাওয়ার পথে বাসে একবার এক মেয়ের পাশে বসার সুযোগ হয়েছিল!
স্যার: আজ কি পরীক্ষা তোমার?
ছাত্র: রাষ্ট্রবিজ্ঞান, স্যার
স্যার: হুম, বলো দেখি বিজ্ঞান কি?
ছাত্র: আসলে স্যার, সহজ কথায় বলতে গেলে আমাদের চারপাশে যা আছে তাই বিজ্ঞান
স্যার: ক্যান ইউ ইলাবোরেট প্লিজ?
ছাত্র: এই যে স্যার পরীক্ষা দিতে আসছি, ফাইলের ভেতর রাখা আছে জ্যামিতি বক্স এটা একটা বিজ্ঞান, লেখার জন্য কলম ইউজ করব এই কলমটাও বিজ্ঞান বলতে গেলে স্যার, ফাইলের জিপ থেকে আপনার হাতে থাকা OMR শিট সবই বিজ্ঞান!
স্যার: এগুলা সব বিজ্ঞান?
ছাত্র: হুম, এক সেকেন্ড স্যার এক্সাম্পল দিচ্ছি এই দেখুন স্যার,  OMR শিটে নাম্বার লিখছি, আর বৃত্ত ভরাট করছি লিখছি, ভরাট করছি লিখছি, ভরাট করছি ডট ডট ডট!
স্যার: ফাজলামো করো? বিজ্ঞানের সংজ্ঞা কি সেটা বলো?
ছাত্র: এতোক্ষণ সংজ্ঞাই তো বললাম, স্যার। সহজ ভাষায়!
স্যার: বইয়ের ভাষায় বলো
ছাত্র: স্যার ওইটাই তো...
স্যার (পাশের জনকে উদ্দেশ্য করে): তুমি বলো দেখি বিজ্ঞান কি?
মেয়ে: হি হি... প্রাকৃতিক সামাজিক বিশ্বকে বোঝার জন্য প্রমাণ নির্ভর নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে জ্ঞানের অনুসন্ধানই বিজ্ঞান স্যার
স্যার: বাহ! কি সুন্দর সংজ্ঞা!
ছাত্র: কিন্তু স্যার, আমিও তো একই কথা বলেছিলাম সহজ ভাষায়!
স্যার: শাটআপ...
ছাত্র: স্যরি স্যার?
স্যার: সহজ ভাষায় সংজ্ঞা বলতে হলে বাইরে গিয়ে অন্য কারো সামনে বলবে, আমার স্যামনে নয়! বুঝছ? যাও এখন বাইরে চলে যাও।
ছাত্র: ওকে, স্যার যাচ্ছি...

কিছুক্ষন পর...
স্যার: একি! আবার ফিরে আসছো যে?
ছাত্র: কিছু একটা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, স্যার
স্যার: কি সেটা?
ছাত্র: Science is a branch of knowledge or study dealing with a body of facts or truths systematically arranged and showing the operations of general laws.
স্যার: মানে কি?
ছাত্র: মানে প্রবেশপত্র, স্যার! প্রবেশপত্রটা নিতে ভুলে গিয়েছিলাম! নিয়ে যাব?
স্যার: সংজ্ঞা জানো সেটা আগে বললেই পারতে! এতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলার কি দরকার ছিল!
ছাত্র: একটু আগে তো সহজ করে বলতে চাইলাম! আপনি সুযোগ দিলেন কই?!!
স্যার: যাও তোমার সিটে বসে সুন্দর করে পরীক্ষা দাও গিয়ে...
ছাত্র: ধন্যবাদ, স্যার!

লেখা ও আঁকা: রবিউল ইসলাম সুমন
প্রথম প্রকাশ: প্যাঁচআলদৈনিক সমকাল
(৮ জুন ২০১৫)

Wednesday, March 11, 2015

হরতালের গোলমালে!

থাকব না'ক বদ্ধ ঘরে
দেখব এবার জগৎটাকে...

ছোটবেলায় পড়া কবিতার এই লাইন দুটি একেবারে ফেভিকলের আঠার মতো মনের মধ্যে গেঁথে আছে বন্ধু আসিফের! আর তাই সে ঘরের চেয়ে বাইরে ঘুর ঘুর করে সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করে। যেকোনো সভা-সমাবেশ আর রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে আসিফের থাকা চাই-ই চাই। এর মানে এই নয় যে সে একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ বা কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য। আসিফ এগুলো করে বেড়ায় দু-চার পয়সা ইনকাম আর পেট পুরে এক বেলা খাওয়ার আশায়!
আসিফের মুখে শুনেছি, এসব সভা-সমাবেশ আর মিছিল-মিটিংয়ে উপস্থিত থাকলেই নাকি নানা কিসিমের খানাখাদ্য আর কিছু পয়সাপাতিও পাওয়া যায়। আর এসবের লোভে সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব দলের মিছিল-মিটিংয়েই যোগদান করত সে।
আসিফের ভাষ্য মতে, সে একজন সাহসী পাবলিক। আর তাই বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রথম সারিতেই তার অবস্থান। হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভের মতো বড় বড় কর্মকাণ্ডের নেতৃত্বও নাকি দেয় সে। আর প্রতিটি কর্মসূচির পর পরই এগুলোতে তার সাহসিকতার অবদান তুলে ধরে বন্ধু মহলের সামনে। কোন হরতালে কয়টা গাড়ি পুড়িয়েছে, ইটের আঘাতে কয়জন পুলিশকে আহত করেছে এবং কয়টা রিকশার হাওয়া ছেড়েছে- এসব ঘটনা অবলীলায় বলে বেড়ায় বন্ধুদের সামনে। আর এ ঘটনাগুলোই নাকি তার অতি সাহসিকতার নমুনা!
যা-ই হোক, একদিন আসিফ বন্ধু মহলে হরতালের দাওয়াত দিল। মানে রাজপথে মিছিল, ভাঙচুর আর পিকেটিংয়ের নেমন্তন্ন আর কী! আসিফ জানায়, এবারের হরতাল বেশ কড়াকড়ি হবে, তাই এর জন্য অনেক লোকের দরকার। তাছাড়া মিছিলে উপস্থিত থাকলেই নাকি জনপ্রতি ১০০ টাকা এবং এক বেলা খাওয়ারও ব্যবস্থা আছে। দারুণ সুখবর! বন্ধু মহলের সবাই যেহেতু বেকার, তাই ভেবেছিলাম এমন আকর্ষণীয় অফার পেয়ে মিছিলে যেতে সকলে এক পায়ে খাঁড়া থাকবে। কিন্তু না। পরিবারের নিষেধাজ্ঞা আর হামলা-মামলার ভয়ে কেউই আসিফের প্রস্তাবে রাজি হলো না। একমাত্র আমিই রাজি হয়ে গেলাম আসিফের সঙ্গে হরতালের মিছিলে যোগ দিতে। মিছিল করলে টাকা পাব এর জন্য নয়, আমি রাজি হয়েছি বন্ধু আসিফ এত দিন নিজের সাহসিকতার যে গল্পগুজব করে আসছে, সেগুলো কত ভাগ সত্য এটা নিজ চোখে দেখতে।
কথামতো হরতালের দিন সকালে দেখা করলাম বন্ধু আসিফের সঙ্গে। হরতালের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত একটি বিশাল ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আসিফ। আমাকে দেখে ব্যানারটি ধরে দাঁড়াতে বলল সে। আমিও তা-ই করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই শ-খানেক লোক জড়ো হয়ে গেল মিছিলে যোগ দিতে। আমি আর আসিফ ছিলাম একেবারে প্রথম সারির মাঝামাঝি। ইতিমধ্যেই এলাকার কিছু বড়ভাই ওরফে দলীয় নেতা-কর্মী এসে যোগদান করলেন আমাদের সঙ্গে। আমাদের নির্দেশ দেওয়া হলো, এলাকা থেকে মিছিলটি বের করে শহরের বিভিন্ন অলিগলি আর সড়ক প্রদক্ষিণ করে আমরা যেন আবার নিজ এলাকায়ই সমবেত হই।
বড়ভাইদের নির্দেশে মিছিল নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকলাম আমরা। মিছিলটি এলাকার গলি ছেড়ে মূল সড়কের কাছে যেতেই হঠাৎ শোনা গেল বিকট শব্দ। আর এই শব্দ শুনে কান দুটি একেবারে গরম হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই ধোঁয়ায় ছেয়ে গেল আমাদের চারপাশ। বুঝতে বাকি নেই যে আশপাশে কোথাও ককটেল বিস্ফোরণ হয়েছে। আর তাই মিছিলে উপস্থিত সবাই এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগল। দেখলাম, আসিফও প্রাণের ভয়ে আমাকে রেখেই দিল ভোঁ-দৌড়। কিন্তু বেচারা খুব একটা অগ্রসর হতে পারেনি। দুই কদম সামনে যেতেই হোঁচট খেয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। আমি গিয়ে তাকে টেনে তুললাম। মাটি থেকে উঠে আসিফ আমাকে বলল, দোস্ত... শিগগির পালা। আমাদের মিছিলে বোমা হামলা হয়েছে। বাঁচতে চাইলে এখনই পালাতে হবে। এই বলে সে আবারও দৌড় দিতে চাইল। কিন্তু পারল না। আমি তাকে থামালাম। অবাক হলো আসিফ। বলল, তোর কি জীবনের মায়া নেই? বললাম, আছে। ও এবার রেগেমেগে চেঁচিয়ে উঠল, তাহলে পালাচ্ছিস না কেন? আমি ওপরের দিকে হাত উঠিয়ে তাকে আসল ব্যাপারটা দেখালাম আর বললাম- তোরা যেটাকে বোমা বিস্ফোরণ মনে করেছিস এটা আসলে বোমা না! এটা ছিল বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের শব্দ!
শুনে বেশ অবাক হলো আসিফ। সাথে একটু লজ্জাও পেল মনে হয! এরপর সে ওপরে তাকিয়ে বলল, আরে তা-ই তো! দেখ দেখ... এখনো থেমে থেমে আগুনের ফুলকি আর ধোঁয়া বের হচ্ছে ট্রান্সফরমার থেকে!

লেখক: রবিউল ইসলাম সুমন
প্রথম প্রকাশ: ঘোড়ার ডিম, দৈনিক কালের কন্ঠ (২৩ ডিসেম্বর ২০১২)